খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জানুয়ারি ২০১৫, ৪:৯ পিএম

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় লালমনিরহাট জেলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল।
লালমনিরহাট, কালীগঞ্জ অঞ্চলের লোকসমাজে প্রচলিত ভাষার লক্ষ্যণীয় কিছু বিশেষ দিক নিম্নে প্রদত্ত হলো-
1. ক্রিয়াপদের আগে ‘না’ এর ব্যবহার। যেমন ; না খাওঁ (খাইনা), না যাওঁ (যাইনা)।
2. ‘র’ বর্ণের স্থলে ‘অ’ বর্ণ ব্যবহারের প্রবণতা। যেমন ; অং (রং), অসূণ (রসূণ)।
3. ‘ল’বর্ণের স্থলে ‘ন’ বর্ণ ব্যবহারের প্রবণতা। যেমন ; নাল (লাল), নাউ (লাউ)।
4. স্থানের নামের শেষের বর্ণে এ-কার থাকলে তা তুলে দিয়ে শব্দের শেষে ‘ত’ বর্ণ যুক্তকরণের প্রবণতা। যেমন; মাঠত (মাঠে), ঘাটত (ঘাটে), হাটত (হাটে)।
5. ভবিষ্যতে স্বয়ং কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে ক্রিয়াপদের শেষে ‘ম’ বর্ণ ব্যবহারের প্রবণতা। যেমন ; যাইম, খাইম, দেখিম।
6. সম্বোধনের ক্ষেত্রে ব্যবহুত কতিপয় শব্দের উদাহরণ হচ্ছে- মুঁই (আমি), হামরা (আমরা), তুঁই (তুমি), তোমরাগুলা (তোমরা), অঁয় (সে), ওমরা/ওমরাগুলা (তারা)।

লোকসমাজে প্রচলিত ছড়া, ছেল্লক (ধাঁধাঁ বা ছিল্কা), প্রবাদ-প্রবচন, মেয়েলী গীত, মন্ত্র, লোকসঙ্গীত প্রভৃতি লোক সাহিত্যের মূল্যবান উপাদান। এগুলোর মধ্য দিয়ে সন্ধান মিলে আবহমানকাল ধরে চলে আসা মানুষের রুচি, বিশ্বাস, আচার-আচরণ, সংস্কার, রসবোধ, সুখ-দুঃখ, উপদেশ, নিষেধ ইত্যাদির। নিম্নে এ জেলার লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো-
শিশু মনের অন্যতম খোরাক হচ্ছে-ছড়া। লোকসমাজে মায়েরা যেমন বিভিন্ন ছড়া বলতে বলেতে শিশুদের ঘুমপাড়ায়, তেমনি ছোট ছেলে-মেয়েরা খেলায় বিভিন্ন ধরণের ছড়া ব্যবহার করে থাকে। তাছাড়া অন্যকে ক্ষেপিয়ে তুলতেও এরব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ ব্যাপক প্রচলিত কয়েকটি ছড়া নিম্নেপ্রদত্ত হলো-
আয় নিন্দো বায় নিন্দো
পাইকোরের পাত
কান কাটা কুকুর আইসে
ঝিৎ করিয়া থাক।
ইচিং বিচিং তিচিং চা
প্রজাপতি উড়ে যা
ইষ্টেশনের মিষ্টি কুল
শখের বাদাম গোলাপ ফুল।
ফুলন ফুলন ফুলনটি
একেতে দুলনটি
দুলন দুলন দুলনটি
একেতে তিলনটি
তেলন তেলন তেলনটি
একেতে ঝামনটি
ঝামন ঝামন ঝামনটি
একেতে জোড়ঝামনটি।
ঐ চেংরিটাক ধরতো
কইল্ল্যা ভাজি করতো
কইল্ল্যাত ক্যানে পোকা
ধর শালীর খোঁপা
খোঁপা ক্যানে ঢিল
মাইয়াক ধরি কিল।
নাড়িয়া মাথা ঢোলে
পাদি দিলে ফোলে।
ছেল্লক গ্রাম্য সমাজে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। বুদ্ধি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অতুলনীয়। লালমনিরহাট জেলার অশিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত ও শিক্ষিত সমাজে প্রচলিত কিছু ছেল্লকের উদাহরণ নিম্নেপ্রদত্ত হলো-
অর্ধচন্দ্রে বিন্দুযুত্তু ককারে আকার
পাঠারে ভাসাইয়া দিয়া মধ্য নিবে তার
লবণের প্রথমটি তাহাতে মিশাইয়া
হইবে যাহা দিবে পাঠাইয়া।
উত্তরঃ কাঁঠাল।

লোকসমাজে কথায় কথায় যে সব প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহুত হয় তা একদিকে যেমন শিক্ষনীয়, অন্যদিকে তেমনী ছন্দের অপূর্ব সমন্বয়। এ জেলার লোক-সমাজ প্রবাদ-প্রবচনের অফুরন্তভান্ডার। বিভিন্ন বিষয়ে সচরাচর যে সব প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়, সেগুলোর কিয়দাংশ নিম্নেপ্রদত্ত হলো-
আগা হাল য্যাদি যায়
পাছা হালও স্যাদি যায়।
আগাত আছিনু মল্লের মাও
এ্যালা গবর ফ্যালাওঁ আর ভাত খাওঁ।
(মল্লের = মোড়লের, এ্যালা = এখন)
এ জেলায় প্রচলিত লোকসঙ্গীতের মধ্যে ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি এবং বাউল সঙ্গীতই প্রধান। কুষাইন গান, কবি গান, পালাগান, সাদা পাগলার গান, গাঁথার গান প্রভৃতি লোকসঙ্গীতের আসর এখন আর খুব বেশি নজরে পড়েনা।
মন্তব্য